ঢাকা  শনিবার, ১লা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ১৪ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Homeবাণিজ্য৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ব্যাংক ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশই অনাদায়ী

৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ব্যাংক ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশই অনাদায়ী

অর্থনৈতিক স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাড়তি সুদহারের প্রভাবে সাধারণত ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা থাকলেও দেশের ব্যাংক খাতে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের প্রায় অর্ধেকই এখন খেলাপি, যেখানে ১ কোটি টাকার কম ঋণের খেলাপির হার মাত্র ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ খেলাপি ছিল। তবে ঋণের অঙ্ক যত বড়, খেলাপির হার তত বেশি। ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপি ২৬ দশমিক ১ শতাংশ হলেও ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশে। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ।

ব্যাংক নির্বাহী ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা সাধারণত ব্যাংক ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করেন। বিপরীতে বড় উদ্যোক্তাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের যোগসাজশে বড় অঙ্কের ঋণ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অনেক বড় ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়েছেন বা গ্রেফতার হয়েছেন, যার প্রভাব খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) সবচেয়ে বেশি ঋণদাতা ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার আড়াই শতাংশের নিচে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান জানান, ছোট ঋণে খেলাপির হার প্রায় ১ শতাংশ। সঠিক গ্রাহক বাছাই ও নিবিড় তদারকির কারণেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ন্যানো লোন কর্মসূচিও সফল হয়েছে। বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে জামানতবিহীন এ ঋণে খেলাপির হার মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, সঠিক গ্রাহক নির্বাচন ও করপোরেট সুশাসন মেনে চলার ফলেই ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন, লেবানন কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান ও শ্রীলংকার চেয়েও বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অতীতে অনিয়মের মাধ্যমে অনেক খেলাপি ঋণ গোপন রাখা হয়েছিল। গত এক বছরে সেই ‘কার্পেটের নিচে লুকানো’ খেলাপি ঋণ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি জানান, প্রকৃত উদ্যোক্তা ও বিশেষ করে সিএমএসএমই খাতের ব্যবসায়ীরাই নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণে বড় গ্রহীতাদের অবদান বেশি হলেও ঋণ পেতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। অথচ দেশের মোট শিল্পের ৯৮ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই এসএমই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানো গেলে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

RELATED ARTICLES