অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে ব্রিটিশ একটি সংবাদপত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান মামলার শুনানিতে অংশ নিতে চলতি সপ্তাহে লন্ডনে ফিরছেন ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস ও প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার কনিষ্ঠ পুত্র প্রিন্স হ্যারি। দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছেন তিনি, এটি তার শেষ মামলা।
এএফপি জানায়, সোমবার লন্ডনের হাইকোর্টে মামলাটির বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ নয় সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে। এটি প্রিন্স হ্যারির করা তৃতীয় এবং চূড়ান্ত মামলা। মিডিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনাকে তিনি ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন বলে জানা গেছে।
১৯৯৭ সালে প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মা প্রিন্সেস ডায়ানা প্রাণ হারান। পাপারাজ্জিদের তাড়া এড়াতে গিয়েই ওই দুর্ঘটনা ঘটে বলে দাবি করা হয়। সে কারণেই দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমের ভূমিকাকে দায়ী করে আসছেন প্রিন্স হ্যারি।
রাজা তৃতীয় চার্লসের কনিষ্ঠ পুত্র হ্যারি আরও ছয়জন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যৌথভাবে মামলাটি করেছেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী এলটন জন ও তার স্বামী ডেভিড ফার্নিশ।
এই সাতজনের অভিযোগ, ডেইলি মেইল ও মেইল অন সানডে পত্রিকার প্রকাশক অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপারস সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়ির ভেতরে গুপ্ত অডিও যন্ত্র বসাতে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগ করা হয়। এছাড়া ভুয়া পরিচয়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগত ফোনালাপে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
তবে সংবাদপত্র গোষ্ঠীটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘অশোভন’ বলে দাবি করেছে।
বিচারের প্রাথমিক তিন দিনের কিছু অংশে প্রিন্স হ্যারির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আইনজীবীদের দেওয়া খসড়া সূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার তিনি পুরো দিন সাক্ষ্য দেবেন। পরবর্তী সপ্তাহে অভিনেত্রী এলিজাবেথ হারলি সাক্ষ্য দেবেন। ফেব্রুয়ারির শুরুতে এলটন জন ও ডেভিড ফার্নিশের সাক্ষ্য গ্রহণের কথা রয়েছে। অভিযোগকারীদের তালিকায় অভিনেত্রী স্যাডি ফ্রস্টও রয়েছেন।
২০২৩ সালে মিরর গ্রুপ নিউজপেপারসের বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া প্রথম জ্যেষ্ঠ ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নজির গড়েন প্রিন্স হ্যারি। এটি তার জন্য যুক্তরাজ্যে একটি বিরল সফর।
ডিউক অব সাসেক্স নামে পরিচিত হ্যারি ২০২০ সালে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে স্ত্রী মেগান মার্কলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি তাদের দুই সন্তানসহ অবস্থান করছেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে সর্বশেষ সফরের সময় তিনি রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও এবারের সফরে রাজা চার্লসের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম।
নতুন এই বিচারটি রুপার্ট মারডকের নিউজ গ্রুপ নিউজপেপারস এবং মিরর গ্রুপের বিরুদ্ধে আগের মামলাগুলোর ধারাবাহিক অংশ। গত বছর নিউজ গ্রুপের সঙ্গে আদালতের বাইরে সমঝোতায় পৌঁছান প্রিন্স হ্যারি।
দ্য সান ও বর্তমানে বন্ধ হয়ে যাওয়া নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড পত্রিকার প্রকাশক এনজিএন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রিন্স হ্যারিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়। একই সঙ্গে ফোন হ্যাকিংসহ বিভিন্ন উপায়ে তার ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করে নেয়।
এক বিবৃতিতে এনজিএন প্রিন্স হ্যারি ও তার মা প্রিন্সেস ডায়ানার ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অনুপ্রবেশের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে। এতে সাংবাদিক ও তাদের নিয়োজিত ব্যক্তিগত তদন্তকারীদের মাধ্যমে নজরদারি ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করা হয়।
মিরর গ্রুপের বিরুদ্ধে আরেক মামলায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আদালত রায় দেন যে, প্রিন্স হ্যারি ফোন হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। ওই মামলায় তাকে এক লাখ ৪০ হাজার ৬০০ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
মিডিয়া আইনজীবী মার্ক স্টিফেন্স এএফপিকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তবে এই শেষ মামলাটি মূলত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি অবৈধ নজরদারি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

