২০১১ সালের ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর প্রথমবারের মতো বুধবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে এর জাপানি পরিচালনাকারী সংস্থা। তবে কেন্দ্রটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
নিগাতা প্রদেশে অবস্থিত কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর অনুমোদন গত মাসে দেন প্রদেশটির গভর্নর। যদিও এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে জনমত স্পষ্টভাবে বিভক্ত।
টোকিও থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার (টেপকো) বুধবার জানিয়েছে, তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে এবং সন্ধ্যা ৭টার পর নিয়ন্ত্রণ রড সরিয়ে রিঅ্যাক্টর চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগের দিন মঙ্গলবার তীব্র শীত উপেক্ষা করে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী বরফের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রবেশপথে প্রতিবাদ জানান। জাপান সাগরের উপকূলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এই কেন্দ্রের ভবনগুলো ঘিরে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ পায়।
কাশিওয়াজাকির ৭৩ বছর বয়সী বাসিন্দা ইউমিকো আবে এএফপিকে বলেন, ‘এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যায় টোকিওতে। তাহলে এখানকার মানুষ কেন ঝুঁকির মুখে পড়বে—এর কোনো যুক্তি নেই।’
গত সেপ্টেম্বরে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দা কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিপক্ষে, আর ৩৭ শতাংশ এর পক্ষে মত দিয়েছেন।
সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতার বিচারে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলেও বুধবার সাতটি রিঅ্যাক্টরের মধ্যে মাত্র একটি চালু হচ্ছে।
২০১১ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক কেন্দ্রে তিনটি রিঅ্যাক্টর গলে যাওয়ার ঘটনার পর জাপান পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে সরে আসে এবং সে সময়ই এই কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তবে সম্পদস্বল্প জাপান এখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির বাড়তি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তি পুনরুজ্জীবনের পথে হাঁটছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ উদ্যোগের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
ফুকুশিমা-পরবর্তী কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ডের আওতায় পশ্চিম ও দক্ষিণ জাপানে এখন পর্যন্ত ১৪টি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু হয়েছে, যার মধ্যে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৩টি সচল ছিল।
কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ার এই ইউনিটটি হবে টেপকোর পরিচালিত প্রথম রিঅ্যাক্টর, যা ২০১১ সালের পর পুনরায় চালু হচ্ছে। টেপকোই ফুকুশিমা দাইইচি কেন্দ্র পরিচালনা করে, যা বর্তমানে ধাপে ধাপে বন্ধ করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
৮১ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী কেইসুকে আবে বলেন, ‘বিপর্যয়ের প্রায় ১৫ বছর পরও ফুকুশিমার পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অথচ টেপকো আবার একটি কেন্দ্র চালু করতে চাইছে—এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
বিশাল কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কমপ্লেক্সে ১৫ মিটার উঁচু সুনামি প্রতিরোধ দেয়াল, উঁচুতে স্থাপিত জরুরি বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা উন্নয়ন যুক্ত করা হয়েছে। তবুও বাসিন্দারা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তারা অতীতে তথ্য গোপনের কেলেঙ্কারি, ছোটখাটো দুর্ঘটনা এবং অপর্যাপ্ত বলে দাবি করা সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন।
কারিওয়ার ৭৯ বছর বয়সী বাসিন্দা চিয়ে তাকাকাওয়া বলেন, ‘জরুরি অবস্থায় লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব—আমি তা বিশ্বাস করি না।’
৮ জানুয়ারি কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিরোধিতা করে সাতটি গোষ্ঠী প্রায় ৪০ হাজার মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি পিটিশন টেপকো ও জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়। পিটিশনে বলা হয়, কেন্দ্রটি একটি সক্রিয় ভূমিকম্প-ফল্ট অঞ্চলে অবস্থিত এবং ২০০৭ সালেও এটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে আক্রান্ত হয়েছিল।
২০১১ সালের বিপর্যয়ের আগে জাপানের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসত পারমাণবিক শক্তি থেকে। ওই বিপর্যয়ে প্রায় ১৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জাপানের পারমাণবিক শিল্প একাধিক কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিকম্প ঝুঁকি কম দেখাতে চুবু ইলেকট্রিক পাওয়ারের তথ্য জালিয়াতির ঘটনাও রয়েছে। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ায় টেপকো শনিবার জানিয়েছে, পরীক্ষার সময় একটি অ্যালার্ম ব্যবস্থা কাজ করেনি।
আসাহি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টেপকোর প্রেসিডেন্ট তোমোআকি কোবায়াকাওয়া বলেন, ‘নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। পারমাণবিক খাতে জড়িতদের কখনোই উদ্ধত বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত নয়।’
চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও রাশিয়ার পর জাপান বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকারী দেশ। ২০২৩ সালে দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ এসেছে কয়লা, গ্যাস ও তেল থেকে। আগামী ১৫ বছরে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তি বাড়িয়ে এ হার ৩০–৪০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে টোকিও।
সরকারের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসবে পারমাণবিক শক্তি থেকে—যা ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৮.৫ শতাংশ।
এদিকে, ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার বিশাল কাজ এখনো জাপানের সামনে রয়ে গেছে, যা সম্পন্ন হতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে।

