ঢাকা  রবিবার, ২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Homeবিশ্বইরানে মার্কিন হামলা কঠিন কেন

ইরানে মার্কিন হামলা কঠিন কেন

উন্নয়ন বার্তা ডেস্ক:
সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরানে ব্যাপক সহিংসতার অভিযোগ তুলে ‘সামরিক পদক্ষেপ’ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রকাশ্যে কঠোর বক্তব্য দিলেও বাস্তবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কার্যকরভাবে সহায়তা করার মতো কোনো সহজ বা বাস্তবসম্মত সামরিক কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। যদিও ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর ট্রাম্প প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।

ইরানের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান সামরিক প্রস্তুতি বা বাহিনী মোতায়েনের চিত্র দেখা যায়নি। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি কমিয়েছে, যা সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাকে আরো দুর্বল করে। অন্যদিকে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন নেই। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর প্রায় দুই বছর ধরে এই অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে মার্কিন রণতরী উপস্থিত ছিল।
 
এখন ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিবীয় অঞ্চলে এবং ইউএসএস নিমিৎজ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইরানে হামলা চালাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কাতার, বাহরাইন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান কিংবা সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে ওই ঘাঁটিগুলোও ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। ট্রাম্পের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে গত জুনে ফোরদোতে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো দূরপাল্লার বি-২ বোমারু বিমানের মতো অভিযান।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন হামলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তবু তেহরানের কাছে এখনো প্রায় দুই হাজার ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলোর পুনর্গঠনও চলছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র আসলে কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে। বিক্ষোভ এবং সরকারের দমন-পীড়ন সারা দেশে বিস্তৃত থাকায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা কঠিন। ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলে বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে এবং তাতে বাস্তব কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন নাও আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলাকে ইরানি সরকার জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে এবং নিজেদের পক্ষে জনসমর্থন জড়ো করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ বৈরী ইতিহাস এই প্রচারণাকে আরো জোরালো করবে। জুনে ইসরায়েলের বড় ধরনের আঘাতের পরও ইরানি সরকার ভেঙে পড়েনি।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক রোক্সান ফারমানফারমায়ান বলেন, ইরানে এখনো একটি সুসংগঠিত সরকার, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে, যা যে কোনো মূল্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুত।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে সরাসরি হামলার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে এবং তাতেও সরকার পরিবর্তনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমনকি খামেনির মৃত্যু হলে তার উত্তরসূরির তালিকাও আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ইসরায়েল গত জুনে ইরানের অন্তত ৩০ জন শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে হত্যা করলেও শাসনব্যবস্থা অটুট ছিল। ফলে সীমিত মার্কিন হামলায় ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তাছাড়া ট্রাম্প নিজেই ‘মাঠে সেনা পাঠানো’ বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।

অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে সাইবার হামলার কথাও বিবেচনায় এসেছে। তবে বিদ্যুৎ বা যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাত হানলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। এমনকি ইরানে ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করাও সহজ নয়। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘সহায়তা আসছে’ ধরনের বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তবতা হলো—ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত, আর ঝুঁকি অত্যন্ত উচ্চ।

RELATED ARTICLES