নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে চাপের মুখে থাকা অর্থনীতি। আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় প্রায় সব খাতেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসেনি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, কর্মসংস্থানেও গতি নেই। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে বাজেট বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতিকে “খাদের কিনারা” থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছেন বলে উল্লেখ করেন। রিজার্ভের পতন ঠেকানো, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং ডলার সংকট কিছুটা কমানো—এসব ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও সামগ্রিক স্থবিরতা কাটেনি। তিনি কর আদায় বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বিশেষ করে ব্যাংক খাতে নেওয়া সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী (ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) মনে করেন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা বেড়েছে। তাঁর মতে, নতুন সরকারের উচিত খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করা—বিশেষত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) বলেন, অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। মূল্যস্ফীতি ও সুদহার নিয়ন্ত্রণে এনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে রাজস্ব-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য কমিয়ে ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।
ব্যবসায়ী মহলও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি-ধারাবাহিকতা, আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের মতে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আসবে না।
এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে, বিশেষ করে খাদ্যমূল্য বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। আমদানি পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। ১৪ মাসে সরকারি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটির বেশি। এডিপি বাস্তবায়ন গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, আর রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা ব্যাংক খাতে। খেলাপি ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক কিছু বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ফলে নতুন সরকারের জন্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আস্থা পুনর্গঠনই হবে বড় পরীক্ষা।
সার্বিকভাবে বলা যায়, অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা—এটাই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

